Welcome
আইন ও বিচার আন্তর্জাতিক খেলাধুলা জাতীয় ধর্ম ও জীবন

মামলা আতঙ্ক পরিবহন খাতে!

একুশের আলো রিপোর্ট : কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেছেন মো. রিপন। সম্প্রতি নিজের মোটরসাইকেলে অফিসে যাওয়ার সময় ফার্মগেট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ তাকে থামার সংকেত দেন। এরপর পুলিশ তার মোটরসাইকেলের কাগজপত্র যাচাই করে তাতে কোনো ত্রুটি পাননি। তবে রিপন ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য আবেদনপত্র দিয়ে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। এই কারণ দেখিয়ে তাকে জানানো হয়, মোটরসাইকেল ডাম্পিং করার খরচসহ সব মিলিয়ে দুই হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে তাকে।

এভাবে রাস্তায় নেমে কারণে-অকারণে মামলা ও ডাম্পিং করার ভীতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে অনেক চালককে। নতুন আইনে মোটা জরিমানা করে শুরুতে রাস্তায় মামলার ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি দেখা গেলেও এখন মামলা হচ্ছে ব্যাপক হারে।

সোমবার রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোডে ট্রাফিক পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের মোটরসাইকেলে আগুন দেন শওকত আলী। মামলা দেওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মোটরসাইকেলটি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে সড়ক-মহাসড়কে অপরাধ বিবেচনায় মামলার ধরন ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

নতুন সড়ক পরিবহন আইনে জরিমানার অঙ্ক অনেক বেশি হওয়ায় ছোটখাটো অপরাধে মামলা হলে অনেকে চাপে পড়েন। ছোটখাটো চাকরি বা আয় যারা করেন, তারা মাসে দু-চারটি মামলা খেলে আর্থিক ও মানসিকভাবেও ভেঙে পড়তে দেখা যায়। যেহেতু নতুন আইনে জরিমানা বেশি তাই টুকটাক আইন ভাঙলে তাকে দু-চারবার সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্নিষ্টরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের আগস্ট মাসে সারাদেশে মোট ৮০ হাজার ১৩৭টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন মামলা হচ্ছে দুই হাজার ৬৭১ গাড়ির বিরুদ্ধে। আর আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জরিমানা করা হয় ২৫ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৫ টাকা। এ হিসাবে দিনে পরিবহন খাতে জরিমানা করা হয় ৮৩ লাখ ৩৭ হাজার ৬৯১ টাকা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এম শামসুল হক বলেন, আমাদের এখানে যে কোনো সমস্যা বড় করে সামনে আসার পর তার সমাধান খোঁজা হয়। গোড়াতে সমস্যা সমাধানে কাজ হয় না। যথাযথ আইন না মেনে অনেকে যানবাহন নিয়ে রাস্তায় নেমে গেছে। আমরাই তাদের সেই সুযোগ দিয়েছি। এখন একটু কড়া হলেই তাদের মানবিক সমস্যা দেখা দেবে। আবার এটাও ঠিক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আইন প্রয়োগ চূড়ান্ত বিচারে সার্থকতা নয়, এটা উপলব্ধিতে থাকা জরুরি। করোনাকালে অনেক মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে এটাও সত্য।

এম শামসুল হক আরও বলেন, পরিবহন খাতে সমন্বয় থাকা দরকার। আমাদের এখানে এটা নেই। রাস্তা নেই এর পরও দিনের পর দিন গাড়ি ও চালকদের নতুন নতুন লাইসেন্স দিচ্ছে বিআরটিএ। আবার দুর্ঘটনার পর তারা কোনো দায় নিচ্ছে না। বাসযোগ্য নগরীর জন্য যা দরকার তার অনেক কিছু এখানে অনুপস্থিত। শুধু পুলিশ বল প্রয়োগ করলে সড়কের এই জঞ্জাল দূর হবে না। এ খাতে আমূল সংস্কার দরকার।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান বলেন, রাস্তায় আইন প্রয়োগ করার মূল লক্ষ্য থাকে যাতে মানুষ সতর্ক হয়। জরিমানা করার আগে তার আর্থিক সামর্থ্যের বিষয় দেখা হয়। যুক্তিসংগত কারণে যুক্তিসংগত জরিমানা করতে সার্জেন্টদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। করোনাকালে বিষয়গুলো আরও মানবিকভাবে দেখা হচ্ছে। কোনো পুলিশ সদস্যকে জরিমানা ও মামলার জন্য কোনো টার্গেট দেওয়া থাকে না।

তার ভাষ্য, ট্রাফিক পুলিশ তার কাজের জন্য পুরস্কৃত হয় তবে সেটা শুধু মামলার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে হয় না। কতটা সুবিবেচনার সঙ্গে আইনভঙ্গকারী যানের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, এতে করে যান চলাচলের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ল এসব কিছু বিবেচনা করে পুরস্কার দেওয়া হয়। মামলা করলেই প্রণোদনা বিষয়টি তেমন নয়। আর সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কারও যানবাহন ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয় না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে নতুন আইনে জরিমানার অঙ্ক কমানোর জন্য এরই মধ্যে আমরা আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র ও রেলমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। কোনো ধারায় জরিমানার অঙ্ক দুই হাজার গুণ বেড়েছে। হাইড্রোলিক হর্নের জন্য ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। আরও বিবেচনা ও সতর্ক হয়ে নতুন আইন প্রয়োগ করা উচিত। নইলে অনেকে পথে বসে যাচ্ছেন।

মামলা বেশি ঢাকায়, জরিমানা বরিশালে :পুলিশ সদর দপ্তরের পরিংখ্যান বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর বিভিন্ন ধারায় চলতি বছরের আগস্ট মাসে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ঢাকায়। এক মাসে রাজধানীতে মামলা হয় ১৯ হাজার ২১৪টি। সারাদেশে মোট মামলা ৮০ হাজার ১৩৭টি। চট্টগ্রাম মহানগরে মামলা হয় আট হাজার ১৫৮, রাজশাহীতে তিন হাজার ৬৫৫, খুলনা মহানগরে এক হাজার ৩৮৭, বরিশালে এক হাজার ৭৯২, সিলেটে তিন হাজার ৬১৯, রংপুরে তিন হাজার ৪৫০, গাজীপুরে এক হাজার ২৩, হাইওয়েতে ৯ হাজার ৮৮৫, ঢাকা রেঞ্জে চার হাজার ৯০টি মামলা হয়। আগস্ট মাসে দেশে পরিবহন খাতে জরিমানা করা হয় ২৫ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৫ টাকা। নতুন আইনে ঢাকায় মাসে জরিমানা করা হয় চার কোটি ৭৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। বরিশালে মামলা কম হলেও জরিমানা করা হয়েছে অনেক বেশি। সেখানে আগস্ট মাসে এক হাজার ৭৯২ মামলার বিপরীতে জরিমানা করা হয় তিন কোটি ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ৫০০ টাকা। আর জুন মাসে সারাদেশে পরিবহন খাতে মামলা হয় ৮৭ হাজার ৩২০টি। আর জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২২ কোটি ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭০ টাকা। ওই মাসে সবচেয়ে বেশি ২৫ হাজার ১০৫টি মামলা রেকর্ড হয় ঢাকায়। আর রাজধানীতে সেই মাসে পরিবহন আইনে জরিমানা করা হয় পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ ৬৯ হাজার ১০ টাকা।

দুর্ঘটনা বেশি জাতীয় সড়কে :চলতি বছরের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া ৯১টি দুর্ঘটনার কারণ বিশ্নেষণ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এতে উঠে আসে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা হয়েছে জাতীয় সড়কে। মোট দুর্ঘটনার ৮০.২ শতাংশ জাতীয় সড়কে। সড়ক বিভাজক নেই এমন রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫০.৯ শতাংশ। সড়ক বিভাজক রয়েছে এমন রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটে ১৯.৮ শতাংশ।

Related posts

অটিজম শিশুদের নিয়ে কাজ করবে প্রমোট বাংলাদেশ

admin

ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ আ.লীগ হাইকমান্ড

admin

করোনায় আরো ২৩৯ জনের মৃত্যু

admin

Leave a Comment

Translate »