অগাস্ট ৩, ২০২১
Welcome
আন্তর্জাতিক খেলাধুলা জাতীয় বিনোদন ব্রেকিং নিউজ

ভোগান্তির ঈদযাত্রা

  • স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউ, সব বাহনই মানুষে ঠাসা
  • দুই-তিনগুণ বেশি ভাড়া, খালি নেই পাশের সিট
  • বিভিন্ন স্থানে সড়কজুড়ে শত শত গাড়ির সারি
  • অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে তৎপর পুলিশ

মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি! সড়কে বহুগুণ বেড়েছে মানুষের চলাচল। ছাড়ছেন রাজধানী। ফিরছেন প্রিয়জনের কাছে। করোনা সংক্রমণের মধ্যে এবারের ঈদযাত্রা ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ ও ভোগান্তি বয়ে আনছে। দ্বিগুণ ভাড়া, তীব্র যানজট ও উপচেপড়া ভিড় নিয়ে ছুটছেন সবাই। যাত্রাপথে সড়ক ও নৌপথে সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মানেননি কেউ। সব বাহনই ছিলো মানুষে ঠাসা। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-মাওয়া, গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-আশুলিয়া মহাসড়কে ছিলো ভয়াবহ যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই এলাকায় আটকে ছিলো অনেক গাড়ি। এ ছাড়া নৌপথে ফেরিঘাটে ছিলো ঘরমুখী মানুষের চাপ। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষায় ছিলো শত শত যানবাহন।

যাত্রীদের অভিযোগ, বর্ধিত ভাড়ার দ্বিগুণ আদায় করা হচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে। তা ছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পাশের সিট খালিও রাখা হয়নি। বাসগুলোতে নেই স্বাস্থ্যসুরক্ষার ব্যবস্থা। ঢাকা থেকে কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামগামী যাত্রীরা জানিয়েছেন, দ্বিগুণ ভাড়া দেয়ার পরও টিকিট পাওয়া যায় না।  রাজধানীর সায়েদাবাদের সোহরাব নামের এক যাত্রী বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাওয়ার ভাড়া ২৫০ টাকা। এখন টিকিট কাটতে হয়েছে ৫০০ টাকা দিয়ে। পাশের সিটেও যাত্রী ছিলো। লক্ষ্মীপুরগামী ইকোনো বাসের সুপারভাইজার আবিদ হাসান বলেন, এক সিট ফাঁকা রাখার নিয়ম বেশির ভাগ বাসমালিকই মানছেন না। সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের থেকে ভাড়া কিছুটা কম রাখছে। তিনি বলেন, ৬০ শতাংশ হিসাবে ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুরের ভাড়া ৬০০ টাকা হলেও তারা ৫০০ টাকা রাখছেন। তাই যাত্রীরা এক সিট খালি রাখার বিষয়টি নিয়ে তেমন আপত্তি করছেন না।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। গতকাল রোববার সকাল থেকে কোনো যানবাহনই নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। এতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ঈদে ঘরমুখী হাজারো মানুষ। সড়কটির বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার চতুর্থ দিন গতকাল সকাল থেকেই সড়কে যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ ছিলো। অনেকে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু সকাল থেকেই সড়কটির চান্দনা চৌরাস্তা থেকে রাজধানীর খিলক্ষেত (ময়মনসিংহগামী সড়ক) পর্যন্ত যানজট লেগেই আছে। এটুকু অংশে গাড়ি চলছে থেমে থেমে, খুবই ধীর গতিতে। এর মধ্যে বেশি খারাপ অবস্থা খিলক্ষেত থেকে টঙ্গীর চেরাগ আলী পর্যন্ত। এতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন দূর-দূরান্তে যাতায়াতকারী অনেক মানুষ।

ফেরিঘাটগুলোতে ভোর থেকে ক্রমেই দীর্ঘ হয়েছে গাড়ির সারি। সকালে শিমুলিয়া ঘাটে দেখা গেছে, ঘাটের এক কিলোমিটার আগেই সবগুলো গাড়িকে আটকে দিচ্ছে পুলিশ। উপায় না পেয়ে যাত্রীরা এক কিলোমিটার আগেই গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে ঘাটে যাচ্ছেন। অথচ ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, তিনটি ফেরি অপেক্ষমান।

পুলিশ দু’-একটা করে গাড়ি ছাড়ছে সেই গাড়িগুলো এসে ফেরিতে উঠছে। স্থানীয় কয়েকজন জানান, পুলিশ ইচ্ছা করেই ঘাট থেকে এক-দেড় কিলোমিটার দূরে গাড়ি আটকে রেখে মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি করছে। অথচ ঘাটে কোনো ভিড় নেই। জানতে চাইলে একজন ট্রাফিক পুলিশ বলেন, সবগুলো গাড়ি ঘাটে প্রবেশ করতে দিলে বিশৃঙ্খলা হবে। সে কারণেই দূরেই আটকে রাখা হচ্ছে।

অন্যদিকে এক কিলোমিটার দূরে গাড়ি আটকে রাখার সুবাদে যাত্রীরা হেঁটে ঘাটে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে ইজিবাইক চালকরা এই গ্যাপে বেশি টাকায় ভাড়া মারছে। কয়েকজনের অভিযোগ, পুলিশ ইচ্ছা করেই ইজিবাইক চালকদের এই সুযোগ করে দিচ্ছে। বিনিময়ে তারা ইজিবাইক চালকদের কাছে থেকে দ্বিগুণ চাঁদা নিচ্ছে।

অন্যদিকে, একই চিত্র ছিলো ঢাকার সদরঘাটেও। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি ছিলো চরম উপেক্ষিত। ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানিয়েছেন, দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দিয়ে কেবিন ও চেয়ার পেতে রাখা হয়েছে। হাতিয়ার যাত্রী এনামুল হক বলেন, হাতিয়ার লঞ্চগুলোতে ডিলাক্স কেবিনের ভাড়া এক হাজার ১০০ টাকা। সে কেবিন পেতে তাকে দুই হাজার ৫০০ টাকা গুনতে হয়েছে। বরিশাল-চাঁদপুরে লঞ্চেও দেখা গেছে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মানতেও দেখা যায়নি যাত্রীদের। চাঁদপুরের নিয়মিত যাত্রী শাহীন বলেন, কেবিন তো পাওয়া যাচ্ছেই না, কেবিনের সামনের চেয়ার পর্যন্ত ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এমন নজির আগে কখনো দেখিনি। যদিও বিধিনিষেধ শিথিলের প্রজ্ঞাপন জারির পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে যাত্রী ও লঞ্চ মালিকদের জরিমানা করা হবে। তবে দ্বিতীয় দিন থেকে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। এদিকে মহাসড়কে তীব্র যানজট ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে বহুগুণ। সাভারে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের নবীনগর থেকে বাড়াইপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার থেকে নবীনগর পর্যন্ত আরিচামুখী লেনে আট কিলোমিটার ও গেণ্ডা থেকে হেমায়েতপুর ছয় কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট ছিলো। পাশাপাশি টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কে আশুলিয়া বাজার থেকে ধউর তিন কিলোমিটার ও জিরাব থেকে বাইপাইল পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় ঢাকা থেকে আরিচাগামী লেনে যানজটের ফলে গাবতলী এলাকা থেকে সাভার পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। এ ছাড়া সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে নবীনগর-বাইপাইল পর্যন্ত পৌঁছতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। সেই সঙ্গে তীব্র গরমে দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে আটকে থাকায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় যাত্রীদের। অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায়ও প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। দুপুরের পর শুরু হওয়া এ যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষ ও গাড়িচালকরা। মহাসড়কে থেমে থেমে যানবাহন চলেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের দ্রুতযান এক্সপ্রেসসহ বেশ কিছু ট্রেনেও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। যদিও ট্রেনের টিকিট কাটতে হচ্ছে অনলাইনে, কিন্তু রেলওয়ের অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশে ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে তৎপর পুলিশ : ঈদ যাত্রায় সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে বিভিন্ন পরিবহন যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে সে জন্য তৎপর রয়েছে পুলিশ। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেয়া হচ্ছে কঠোর ব্যবস্থাও। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মো. সোহেল রানা জানান, ঈদকে সামনে রেখে কোনো পরিবহন যেনো যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া না নিতে পারে সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি করছে পুলিশ। কোনো যাত্রী এ সংক্রান্ত অভিযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সড়কজুড়ে শত শত গাড়ির সারি : পদ্মায় তীব্র স্রোত থাকায় একদিকে ফেরি চলাচলে সময় লাগছে বেশি, অন্যদিকে ঈদকে কেন্দ্র করে শিমুলিয়াঘাটে ব্যক্তিগত গাড়ির বাড়তি চাপ রয়েছে। এতে ঘাটের অভিমুখে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে পারাপারের অপেক্ষায় শত শত গাড়ি। এমনকি কিছু গাড়িকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ২৪-৩০ ঘণ্টারও বেশি সময়। গতকাল সকাল থেকে সরেজমিন দেখা যায়, এক্সপ্রেসওয়ের মাওয়ামুখী লেনে দোগাছি থেকে শ্রীনগর ছনবাড়ির কাছাকাছি কয়েক কিলোমিটার সড়কজুড়ে শত শত গাড়ির সারি। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা এসব পরিবহনের চালক-শ্রমিকদের পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। এক্সপ্রেসওয়েতে লেনে পাস দিয়ে চলা অন্যান্য যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়াঘাটের মেরিন কর্মকর্তা জানান, নদীতে পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার ঘাটে যেতে ফেরিগুলোর দ্বিগুণ সময় লাগছে। এদিকে আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকে শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের ঢল রয়েছে। যাত্রী ও যানবাহন পারাপারে নৌরুটে ১৪টি ফেরি ও ৮৪টি লঞ্চ সচল রয়েছে।

মুকুল হোসাইন /দিগন্তর /

Related posts

করোনায় এক দিনে সর্বোচ্চ ১১২ জনের মৃত্যু

admin

ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধের মেয়াদ আরও বাড়ল

admin

না.গঞ্জে হেফাজত-পুলিশ সংঘর্ষে, আহত ২০

admin

Leave a Comment

Translate »